হাড় ভাঙলে প্লাস্টার নাকি অপারেশন? সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণাঙ্গ গাইড

 

হঠাৎ পড়ে গিয়ে বা দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হাড় ভেঙে যাওয়া আমাদের জীবনে এক বড় আতঙ্ক। হাসপাতালে যাওয়ার পর যখন ডাক্তার বলেন, "প্লাস্টার লাগবে" অথবা "অপারেশন করতে হবে", তখন রোগী এবং স্বজনরা দ্বিধায় পড়ে যান।
প্লাস্টার করলেই কি হাড় জোড়া লাগে? নাকি অপারেশন করা বেশি নিরাপদ? আমরা সহজ ভাষায় জানবো কীভাবে এই সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে হয়।

আপনার হাড় কি আসলেই ভেঙেছে? বুঝবেন যে লক্ষণ দেখে

অনেক সময় আমরা সাধারণ মচকানো ভেবে হাড় ভাঙাকে অবহেলা করি। নিচের লক্ষণগুলো থাকলে দ্রুত অর্থোপেডিক সার্জনের পরামর্শ নিন:
  • আক্রান্ত স্থান প্রচণ্ড ফুলে যাওয়া এবং নীল হয়ে যাওয়া।
  • হাত/পা এর স্বাভাবিক আকার নষ্ট হওয়া বা বেঁকে যাওয়া।
  • অঙ্গটি নাড়াচাড়া করতে অসহ্য ব্যথা হওয়া।
  • হাত বা পা দিয়ে ভর দিতে না পারা।
  • চামড়া ফেটে হাড় বেরিয়ে আসা (এটি ইমারজেন্সি)।

প্লাস্টার (Non-surgical) নাকি অপারেশন: সিদ্ধান্ত কিসের ওপর নির্ভর করে?

সব হাড় ভাঙাতেই অপারেশন লাগে না, আবার সব ভাঙা প্লাস্টারে জোড়া লাগে না। একজন সার্জন হিসেবে আমরা মূলত নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করি:

১. হাড়ের অবস্থান (Displacement)

হাড় যদি ভেঙে নিজের জায়গা থেকে খুব বেশি সরে না যায়, তবে প্লাস্টার বা স্ল্যাব দিয়ে সেটি ঠিক করা সম্ভব। কিন্তু হাড় যদি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় বা একটির ওপর আরেকটি উঠে থাকে, তবে অপারেশন করে মেটাল ইমপ্ল্যান্ট (যেমন- প্লেট, স্ক্রু বা রড) দিয়ে হাড়টিকে সোজা করতে হয়।

২. জয়েন্টের ভেতরে ভাঙা (Intra-articular fracture)

যদি ভাঙাটি আপনার জয়েন্টের (যেমন- হাঁটু, কনুই বা কবজি) ভেতরে হয়, তবে নিখুঁতভাবে হাড় না মেলালে ভবিষ্যতে ওই জয়েন্ট জ্যাম হয়ে যেতে পারে বা অস্টিওআর্থ্রাইটিস হতে পারে। এক্ষেত্রে অপারেশন করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

৩. রোগীর বয়স ও শারীরিক অবস্থা

শিশুদের হাড় খুব দ্রুত জোড়া লাগে, তাই তাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্লাস্টারেই কাজ হয়। কিন্তু বয়স্কদের ক্ষেত্রে বা যাদের দ্রুত কাজে ফিরতে হবে, তাদের জন্য অপারেশন বেশি কার্যকর কারণ এতে রোগী দ্রুত মুভমেন্ট শুরু করতে পারে।
প্লাস্টার এবং অপারেশনের তুলনামূলক সুবিধা - অসুবিধা

প্লাস্টার (Conservative)

সুবিধাঃ কাটা-ছেঁড়া নেই, খরচ কম।
অসুবিধাঃ অনেক দিন ভারী প্লাস্টার নিয়ে থাকতে হয়, জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে।

অপারেশন (Surgical)

সুবিধাঃ কাটা-ছেঁড়া নেই, খরচ কম।
অসুবিধাঃ অনেক দিন ভারী প্লাস্টার নিয়ে থাকতে হয়, জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে।

প্লাস্টারের ইন্ডিকেশন

১। হাড়ভাঙার প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে।
২। অপারেশনের আগে হাত/পায়ের ফোলা কমানোর জন্য।
৩। আক্রান্ত অঙ্গের নড়াচড়া বন্ধ করে ব্যথা কমানোর জন্য।
৪। মচকানো/ Sprain এর চিকিৎসায় প্লাস্টার করা হয়।
৫। নির্দিষ্ট কিছু ভাঙা প্লাস্টারের মাধ্যমে চিকিৎসা সম্পন্ন করা যায়।

হাড় দ্রুত জোড়া লাগাতে কিছু জরুরি পরামর্শ

আপনার চিকিৎসা যেভাবেই হোক না কেন, দ্রুত সেরে উঠতে এই নিয়মগুলো মেনে চলুন:
  • ধূমপান বর্জন করুন: ধূমপান হাড় জোড়া লাগার প্রক্রিয়াকে অনেক ধীর করে দেয়।
  • ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার: দুধ, ডিম, ছোট মাছ এবং সবুজ শাকসবজি বেশি করে খান।
  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: আপনার যদি ডায়াবেটিস থাকে, তবে তা অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, নয়তো ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ে।
  • ফিজিওথেরাপি: প্লাস্টার খোলার পর বা সার্জারির পর ডাক্তারের পরামর্শমতো ব্যায়াম করুন।

হাড়ের চিকিৎসায় অবহেলা করবেন না

হাড় ভাঙার চিকিৎসা কোনো কবিরাজ বা হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে গিয়ে জটিল করবেন না। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই আপনাকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারে।

আপনার যদি হাড় ভাঙা বা হাড়ের কোনো সমস্যা নিয়ে কনফিউশন থাকে, তবে সরাসরি পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন।

পরামর্শ বা অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য ভিজিট করুন: reazmahmud.com



আপনার সুস্থতাই আমাদের মূল লক্ষ্য।

Comments